স্টিফেন হকিং এবং তার ভয়ংকর ভবিষ্যতবানী

টেকস্টিফেন হকিং এবং তার ভয়ংকর ভবিষ্যতবানী

আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম পুরোধা গ্যালিলিও গ্যালিলি’র মৃত্যুর ঠিক তিনশত বছর পরে, ১৯৪২ সালের ৮ই জানুয়ারি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডে জন্ম হয় বিজ্ঞান সাম্রাজ্যের আরেক সম্রাট স্টিফেন হকিংয়ের। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, ২০১৮ সালের ১৪ই মার্চ আমাদের ছেড়ে, এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন বিবিসির “সেরা ১০০ ব্রিটন্স” এর ২৫তম স্থান অর্জনকারী এই বিজ্ঞানী। কিন্তু যাওয়ার আগে আমাদের জন্য রেখে গেছেন তাঁর সুদূরপ্রসারী কিছু চিন্তাভাবনা, কিছু ভবিষ্যৎবানী, যেগুলো ভাবনায় ফেলে দিবে আমাদেরকেও। হ্যাঁ, মহান বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের করে যাওয়া কিছু ভবিষ্যতবাণী, যেগুলো টনক নাড়িয়ে দিবে গোটা বিশ্ববাসীর, সেরকম কয়েকটি নিয়েই আজকের এই আয়োজন।

পৃথিবীর বয়স আর মাত্র একশত বছর!

হ্যাঁ, ঠিক এটাই বলে গিয়েছেন বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং। পৃথিবীর দিন শেষ হয়ে এসেছে, একশত বছর পরে আর পৃথিবী বলে কিছু থাকবে না। মানুষকে বাঁচতে হলে নতুন আস্তানা খুঁজে নিতে হবে, অপেক্ষা আর ১০০ বছরের!
বিজ্ঞান ভুত Biggan bhoo স্টিফেন হকিং এবং তার ভয়ংকর ভবিষ্যতবানী
পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং এমনই ভয়ংকর বাণী শুনিয়েছিলেন বিবিসি’র সায়েন্স সিরিজ ‘টুমরো’স ওয়ার্ল্ড’এ। তাঁর দাবি,
“যেভাবে আবহাওয়ার বদল ঘটছে তাতে বেশিদিন আর মানুষের বসবাসের যোগ্য থাকবে না পৃথিবী। নতুন পৃথিবীর সন্ধান করতে হবে তাড়াতাড়ি।”
আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন, বায়ুমণ্ডলে দূষণ, মহামারী, জনসংখ্যার বিস্ফোরণ- এ সবই পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। খুব তাড়াতাড়ি নতুন পৃথিবীর সন্ধান না পেলে মানুষের অস্তিত্ব আর সৌরমণ্ডলে থাকবে না বলেও দাবি করেছেন তিনি।
বিবিসিতে দেখানো এই তথ্যচিত্রে স্টিফেন দেখিয়েছেন, কীভাবে মানুষের নিজেই পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তন কখনোই রোধ করা সম্ভব নয়। প্রযুক্তির ব্যবহার পরিবেশকে দূষিত করবেই। সুতরাং, যতদিন পর্যন্ত না বৃহৎ পরিসরে অক্সিজেন তৈরির প্রযুক্তি আবিষ্কার হবে ততদিন পরিবেশ আমাদের বসবাসের প্রতিকূলে যেতেই থাকবে।
স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, “গ্রিন হাউস ইফেক্ট হল খাদে পড়ন্ত গাড়ির মতো। আমরা খাদে পড়ার সময়টা কোনমতে বাড়াতে পারব, কিন্তু খাদে একসময় আমাদের পড়তেই হবে… … প্যারিস জলবায়ু সম্মেলন থেকে ট্রাম্পের প্রত্যাহার আমাদের পৃথিবীকে ভেনাসে রূপান্তর করবে, তখন এর তাপমাত্রা হবে ২৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো”।
তিনি আরও বলেন, “মানবসভ্যতাকে বাঁচাতে হলে পৃথিবী ছেড়ে অন্য কোনো গ্রহে আমাদর পাড়ি দিয়ে সেখানে বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আর তা করতে হবে আগামী ১০০ বছরের মধ্যেই”।

নতুন বিশ্বে মানব সম্প্রদায়ের রাজত্ব স্থাপন করতে হবে

আগের ভবিষ্যদ্বাণীরই অবশ্যম্ভাবী ধারাবাহিকতা এই প্রেডিকশনটি। বিবিসি’র সায়েন্স সিরিজ ‘টুমরো’স ওয়ার্ল্ড’এ দেয়া সাক্ষাৎকারে পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং বলেন,
“খুব শীঘ্রই পৃথিবী বলে কিছু থাকবে না, হয়তো এই বিশ্ব বলেই কিছু থাকবে না। আমাদের কল্পনার আগেই শেষ দিন চলে আসতে পারে। তাই, দ্রুত পৃথিবী ত্যাগ করার প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে।”
এ লক্ষ্যে হকিং কিছু মিশনও রেখে যান আমাদের সামনে, যেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে মানবজাতি পৃথিবী ধ্বংস হলেও টিকে থাকবে। তাঁর দেয়া মিশনগুলো ছিল-
  • স্পেস ভ্রমণের খরচ অবিশ্বাস্যভাবে কমাতে হবে।
  • নতুন উপায় খুঁজে বের করতে হবে যাতে আমরা খুব দ্রুত এবং একইসময় অনেক দূরবর্তী স্থানে পৌঁছাতে পারি।
  • নতুন পৃথিবী খুঁজে বের করতে হবে।
  • যে গ্রহগুলো সম্পর্কে আমরা জানি, যেমন মঙ্গল, সেসব গ্রহে কিভাবে বসবাসযোগ্য করে তোলা যায়, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। এবং আমাদের নিকটবর্তী যে সব নক্ষত্র, সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কিনা বা থাকা সম্ভব কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে।
প্রসঙ্গত, নাসার বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে প্রাণের সন্ধানে মঙ্গল গ্রহে অনুসন্ধান শুরু করেছেন। উপগ্রহ থেকে পাঠানো ছবিতে সেখানে একসময় প্রবাহমান নদী থাকার অস্তিত্ব ধরা পড়েছে বলে জানিয়েছে নাসা। এ থেকে তাদের অনুমান, সেখানে এক সময় প্রাণের অস্তিত্ব ছিল।
বিজ্ঞান ভুত Biggan bhoo স্টিফেন হকিং এবং তার ভয়ংকর ভবিষ্যতবানী
এছাড়া ইতিমধ্যে সেখানে বসবাসের পরিকল্পনাও শুরু হয়েছে। স্টিফেন হকিং পৃথিবীর অস্তিত্ব সম্পর্কে যে কথা বললেন তাতে অন্যত্র যেতে হবে মানবসভ্যতাকে টিকে থাকতে। তাহলে সেক্ষেত্রে পৃথিবী ছেড়ে কী মঙ্গলেই পা রাখব আমরা? মানুষ সেখানে নতুন ঠিকানা গড়ে নিবে?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই মানবজাতির হুমকির কারণ হবে!

‘এএলএস’ নামক দুরারোগ্য মোটর নিউরন রোগের কারণে পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নড়াচড়া বা কথাবার্তা বলতে পারতেন না। ইকুইলাইজার নামক বিশেষ সফটওয়্যারের সাহায্যে তিনি যা বলতে চাইতেন, তা কথা হিসেবে বের হতো। যে কণ্ঠ তাকে দেয়া হয়েছিলো, তার নাম ছিল ‘পারফেক্ট পল’
বিজ্ঞান ভুত Biggan bhoo স্টিফেন হকিং এবং তার ভয়ংকর ভবিষ্যতবানী
‘পারফেক্ট পল’কে আপগ্রেড করতে চান কিনা, সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর স্টিফেন হকিং বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভাল-মন্দ সব ধরনের কাজ করার সমর্থ আছে, এমনকি যে কাজ মানুষ করতে পারবে না, সে কাজও!’ তিনি আরো বলেন,
“সবথেকে ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে এখনো বোঝা যাচ্ছে না রোবটরা আসলে মানুষের ঠিক কতটুকু ক্ষতি করতে পারে। দারিদ্র্য দূরীকরণ, অসুখ-বিসুখ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় রোবট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এটি হয়ে উঠতে পারে সভ্যতার সবচেয়ে ভয়ংকর এবং শক্তিশালী অস্ত্র। আমার মনে হয় একদিন কেউ এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আবিষ্কার করবে যা দিন শেষে তাঁর স্থানই দখল করে নিবে।”

এলিয়েন থেকে সাবধান!

মহাকাশ কিংবা ভিনগ্রহের প্রাণী নিয়ে বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের মতামতের প্রতি আগ্রহ রয়েছে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে জ্যোতির্বিজ্ঞানী সবার। বেশ কয়েকবার ভিনগ্রহের প্রাণীদের বিষয়ে তার শঙ্কার কথা জানিয়েছেন এ ব্রিটিশ পদার্থবিদ। হকিংয়ের মতে,
“ভিনগ্রহের প্রাণীদের যদি আমরা নিজেদের অবস্থান জানিয়ে দিই তাহলে মঙ্গলের চেয়ে অমঙ্গলের আশঙ্কাই বেশি, বিশেষ করে যদি তারা হয় পৃথিবীবাসীর তুলনায় প্রযুক্তিগত ভাবে অনেক বেশি অগ্রসর। তিনি বলেন, মহাবিশ্বে দূরবর্তী কোনো গ্রহ থেকে যদি উন্নততর প্রাণীরা পৃথিবীতে কোনো সংকেত পাঠায়, সেক্ষেত্রে আমাদের উচিত হবে তাতে সাড়া না দেয়া, নিজেদের অবস্থান সম্বন্ধে জানান না দেয়া। এলিয়েনদের বিশ্বাস করা হবে বড় ধরনের একটা ভুল। তাদের সঙ্গে আমাদের প্রথম যোগাযোগের ফলটা হবে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়কর। ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সঙ্গে সাক্ষাতের ফলটা যেরকম বিপর্যয়কর হয়েছিল আদিবাসী আমেরিকানদের (রেড ইন্ডিয়ান) জন্য।”
মানবজাতিকে সতর্ক করে দিয়ে হকিং আরও বলেন, যতই আমার বয়স বাড়ছে ততই আমার মনে এই ধারণা আরও বদ্ধমূল হচ্ছে যে, মহাবিশ্বে আমরা একা নই। এবং এলিয়েনদের সাথে আমাদের মুখোমুখি হতে হবে খুব সম্ভবত এই শতাব্দীতেই। আমাদের খুবই সতর্ক থাকতে হবে এলিয়েনদের মুখোমুখি হওয়ার সময়।
বিজ্ঞান ভুত Biggan bhoo স্টিফেন হকিং এবং তার ভয়ংকর ভবিষ্যতবানী

অতিমানব (সুপার হিউম্যান) সৃষ্টি হবে

জিন এডিটিং হচ্ছে প্রাণীর ডিএনএতে সংযোজন-বিয়োজন করে নিজের মতো করে একটি প্রাণী তৈরি করা। বর্তমানে মানুষের জিন এডিটিংকে সীমা লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হয় এবং ৪০ দেশে এ ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণ নিষিদ্ধ। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে এ সময়ের সেরা পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং মনে করতেন, একদিন এ পদ্ধতিতেই অতিমানব বা সুপার হিউম্যান তৈরি করা হবে। মৃত্যুর আগে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ সংকলন ‘ব্রিফ অ্যান্সার টু দ্য বিগ কোয়েশ্চেনস’ বইতে এ সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
স্টিফেন হকিং এর মতে,
“এক সময় ধনী অভিভাবকরা জিন এডিটিংর মাধ্যমে গুণাবলী, স্বভাব এবং বুদ্ধিমত্তা যোগ করতে চাইবে তার সন্তানের জিনে। ফলে, ‘সুপার হিউম্যান’ নামক নতুন প্রজন্মের সৃষ্টি হবে। একসময় সাধারণ মানুষ টিকতে না পেরে বা সুপার হিউম্যানদের বৈষম্যের শিকার হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।”
উদাহরণ হিসেবে তিনি Crispr-Cas9 এর কথা উল্লেখ করেন। Crispr-Cas9 হচ্ছে এমন একটি জিন এডিটিং সিস্টেম যেখানে ক্ষতিকর বা আক্রান্ত জিনকে সরিয়ে নতুন জিন স্থাপন করা হয়।
বিজ্ঞান ভুত Biggan bhoo স্টিফেন হকিং এবং তার ভয়ংকর ভবিষ্যতবানী
উপরের সবগুলো ভবিষ্যদ্বাণীই নিঃসন্দেহে ভয় জাগানোর মত। তবে সত্য হচ্ছে এগুলোকে নিতান্তই অবাস্তব বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারে তার যে ভবিষ্যদ্বাণী, সেটা স্বতন্ত্রভাবে যথেষ্ঠ যাচাই-বাছাই করেই নিশ্চিত করেছেন একদল বিজ্ঞানী। তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে আগামী ১২ বছরের মধ্যেই নাটকীয় কোন পরিবর্তন না আনলে এরপর পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনে আর লাগাম পরানো সম্ভব হবে না। যার ফলে অবশ্যম্ভাবী ভাবেই হয়তো পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যাবে মানব সভ্যতা এবং অসংখ্য অন্যান্য প্রজাতি।এছাড়া, মাত্র কয়দিন আগেই চীনের এক বিজ্ঞানী অনৈতিকভাবে মানবশিশুর জিন এডিটিং করে শিশুগুলোকে এইচআইভি-এইডস নিরোধী হিসেবে ভূমিষ্ঠ করার দাবী করেছেন; যা কিনা আন্তর্জাতিকভাবে কঠোরভাবে বেআইনি। তবে সেই বিজ্ঞানীকে পুলিশ গ্রেফতার করলেও যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া-চীন কিংবা ইসরায়েলের গোপন কোন ল্যাবরেটরিতে যে সরকারী উদ্যোগেই মানব জিন এডিট করে সুপার হিউম্যান তৈরির আয়োজন চলছে না- তার নিশ্চয়তা কে দিবে?
তাই সবকিছু বিবেচনা করে বলা যায়, মরে গিয়ে একরকম বেঁচে গিয়েছেন স্টিফেন হকিং। আর তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী অদূর ভবিষ্যতেই বেশ কঠিন সময় অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।
Previous
Next Post »