ভুতের খপ্পরে পড়া একজন বিজ্ঞানীর গল্প

মাঝরাতে হঠাৎ করে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পর দেখলেন অশরীরী কিছু একটা আপনার উপর বসে কিংবা খাটের কিনারে দাঁড়িয়ে আপনার মুখ চেপে ধরেছে। আপনি শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে নড়াচড়া করতে চাচ্ছেন, চিৎকার করতে চাচ্ছেন, কিন্তু পারছেন না। কিংবা ঝড়বৃষ্টির রাতে প্রচণ্ড বজ্রপাতের মাঝে দেখলেন কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে আপনার সামনে। কিংবা ঘুমের ঘোরেই মনে হল হঠাৎ কে যেন নিচে ফেলে দিল ধাক্কা দিয়ে। এমন অনেক গল্পের নিয়মিত শ্রোতা আমরা। হয়তো ঘটেছে এমন ভূতুড়ে সব কাণ্ড আমাদের সাথেই। এমন ঘটনার সাথে ভূত-প্রেতের যোগাযোগ থাকাটা স্বাভাবিক।
ঠিক এমনই কিছু ঘটনা ঘটেছিল প্রতিষ্ঠিত কিছু বিজ্ঞানী এবং গবেষকের সাথে। যত যা-ই হোক, তাঁরাও তো মানুষ! তবে সমস্যা হচ্ছে, আর দশজন সাধারণ মানুষের মত ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে কিংবা ঘুরে উল্টোদিকে দৌড় না দিয়ে তারা করলেন পাগলামী, যেটা তাঁরা সবসময়ই করে থাকেন- ভূত নিয়ে নাড়াচাড়া করে দেখা। আর এ থেকেই “আবিষ্কৃত” হয়েছে কিছু ভূত প্রজাতির আদ্যোপান্ত।

১। ইনফ্রাসাউন্ড এর ভূত!

ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ভিক ট্যান্ডি যে ল্যাবে কাজ করতেন প্রায়ই সহকর্মীরা সেখানে কাজ করতে অস্বস্তি প্রকাশ করতো, অনেকেই অশরীরীর দেখা পেয়েছেন বলে দাবি করতেন। একদিন একাকী কাজ করতে করতে ভিক হঠাৎ লক্ষ্য করলেন তাঁর ‘ফেন্সিং’ খেলার তলোয়ারটা নিজে থেকেই কাঁপছে, কাঁপছে ল্যাবের অনেক হাল্কা বস্তুও। মাথা উঠিয়ে লক্ষ্য করলেন এক অশরীরী তাঁর ডেস্কের কোনায় দাঁড়িয়ে আছে। চোখ মুছে আবার তাকালেন ভিক, মিলিয়ে গেলেও আবার কিছুক্ষণ পর এসে হাজির হল সেই অশরীরী। একলাফে ল্যাব থেকে বের হয়ে বাসায় চলে আসলেন ভিক কিন্তু বৈজ্ঞানিক হওয়াতে সরাসরি ভূতের বিশ্বাসে যেতে দ্বিধায় ভুগছিলেন।
পরের দিন বাসায় থাকা আরেকটি ফেন্সিং এর তলোয়ার হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতেই খট করে একটা ব্যাপার মাথায় আসলো ভিকের। দ্রুত ল্যাবে ফিরে গেলেন, এবং পরীক্ষার মাধ্যমে বুঝতে পারলেন, যেই ভূত তলোয়ার নাড়াচ্ছিল, সেই ভূতই তাকে অশরীরী দেখিয়েছে, এবং সেই ভূতটা হচ্ছে ইনফ্রাসাউন্ড (infrasound)
্বিজ্ঞান ভুত Biggan Bhoot
আমাদের, অর্থাৎ মানুষের শ্রবণক্ষমতা ২০ হার্জ থেকে ২০,০০০ হার্জ পর্যন্ত ২০ হার্জের নিচের  অর্থাৎ ইনফ্রাসাউন্ডের কোন শব্দ আমরা শুনতে পাই না শুনতে না পেলেও আমাদের অন্যান্য ইন্দ্রিয় এবং মস্তিষ্ক  ঠিকই অনুভব করে এর কম্পন এই ইনফ্রাসাউন্ডের প্রভাবেই অস্বস্তি লাগা, চোখের সামনে ছায়া দেখা কিংবা বমির উদ্রেক হতে পারে আর ভূতুড়ে পরিবেশে এই অস্বস্তি লাগা বা ছায়া দেখাই হঠাৎ তীব্র আতংকের কারণ হয়ে দাড়ায় এবং এই ইনফ্রাসাউন্ড প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন হতে পারে ঝড়ো আবহাওয়াতে, বজ্রপাতের সময়, তীব্র বাতাসে; যে সময়গুলো ভূত দেখার জন্য উপযুক্ত সময়!
ফিরে আসি ভিকের ল্যাবে ল্যাবের সব যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে দেখা গেল যে, ল্যাবের একটি ফ্যান ১৯ হার্জের ইনফ্রাসাউন্ড উৎপন্ন করছে এবং ল্যাবের মানুষজনকে ভূত দেখাচ্ছে ফ্যানটি সরানোর পর ল্যাবের ভূতপ্রেত সব মিলিয়ে গেল

২। বাস্তুভূত, কিংবা কার্বন মনোক্সাইডের ক্যারিশমা

উইলিয়াম ভিলমার ছিলেন একজন মার্কিন চক্ষু বিশেষজ্ঞ। মার্কিন প্রেসিডেন্টসহ অনেক বিখ্যাত ব্যাক্তি, তারকা, বিজ্ঞানীই ছিলেন তাঁর নিয়মিত রোগী কিন্তু তিনি মূলত যে কারণে বিখ্যাত, তা হচ্ছে প্যারানরমাল কর্মকাণ্ড নিয়ে ১৯২১ সালে প্রকাশিত তাঁর একটি গবেষণাপত্রের জন্য
গবেষণাপত্রটি তাঁর এক রোগীর পরিবারকে নিয়ে হাসিখুশি চেহারার সেই রোগী নতুন বাসায় ওঠার পর ধীরে ধীরে বিষণ্ণ হয়ে গেল, চেহারার উজ্জ্বলতা কমতে লাগলো হঠাৎ করেই সে বাসায় ভূতের আনাগোনা শুরু হল পরিবারের সদস্যরা নিত্যদিনই শুনতে পেত রাতের বেলা কলিংবেল বাজছে, চালের উপরে দৌড়াদৌড়ির শব্দ প্রায়ই রাতে অশরীরীদের হাঁটতে দেখা যেতো ভিলমার খোঁজ নিয়ে দেখলেন, বাসার প্রাক্তন বাসিন্দারাও বিষণ্ণ রোগ ভুগতেন এবং তাঁরাও ভূতের হাঁটাচলার শব্দ পেতেন
্বিজ্ঞান ভুত Biggan Bhoot  
হতাশাগ্রস্ত জীবনে ভূতের অত্যাচারে যখন জীবন বিপন্ন, ঠিক তখনই ভিলমার হাজির হলেন এক মহান আবিষ্কার নিয়ে আবিষ্কৃত হল যে বাসার ফার্নেসটা ছিল নষ্ট ফার্নেসটা ঘরের বিষাক্ত গ্যাস বাইরে বের করে না দিয়ে ঘরের ভিতরেই ছড়িয়ে দিচ্ছিল আর বর্ণহীন, গন্ধহীন বিষাক্ত গ্যাস কার্বন মনোক্সাইডই অক্সিজেনের মতো শরীরের ভিতরে প্রবেশ করে মনকে বিষণ্ণ করে তোলে, দুর্বল করে ফেলে, বমির উদ্রেক ঘটায় বিষক্রিয়ার মাত্রা বেশি হলে মানুষ মারাও যেতে পারে এবং মৃত্যুর দিকে আগানোর সময় হ্যালুসিনেশানের মাত্রাও বেড়ে যেতে পারে
শুধু ফার্নেস না, কার্বন মনোক্সাইড উৎপাদন হতে পারে ডিজেল-পেট্রোলচালিত গাড়িতে, গ্যাসের চুলায়, লাকড়ির চুলায় ইত্যাদিতে হলুদ শিখাবিশিষ্ট আগুনে নীল শিখার আগুন থেকে বেশি কার্বন মনোক্সাইড উৎপন্ন হয় সুতরাং গ্রামের বাড়ীতে বেড়াতে গিয়ে বা পরিত্যক্ত বাসায় কৌতুহলবশত ঢুকে ভূতের হাঁটাহাঁটি কিংবা দৌড়াদৌড়ি দেখলে জ্ঞান হারানোর আগে কার্বন মনোক্সাইডের অস্তিত্ব আছে কিনা নিশ্চিত হয়ে নিন।

৩। বোবায় ধরা

একটু কল্পনা করুন… হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে চোখ মেলে দেখলেন বীভৎস কোন অশরীরী আপনার বুকের উপর বসে আপনার মুখ চেপে ধরে রেখেছে। গায়ের সকল শক্তি দিয়ে নড়ার চেষ্টা করছেন কিন্তু হাতপায়ের একটা আঙ্গুলও নাড়াতে পারছেন না। তারস্বরে চিৎকার করার চেষ্টা করছেন কিন্তু গলা দিয়ে একফোঁটা আওয়াজও বের হচ্ছে না। খুব পরিচিত না দৃশ্যটা? এ ঘটনার সম্মুখীন হয়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু কেন হয় এমন? বলা নেই, কওয়া নেই, ভূতপেত্নিরা শুধু শুধু কেন আপনার মুখ চেপে ধরতে আসে?
ঘটনাটা আর কিছুই নয়- স্লিপ প্যারালাইসিস; সহজ বাংলায় আমরা যেটাকে বলি “বোবায় ধরা”। সকল স্লিপ প্যারালাইসিস আক্রান্ত মানুষই ঘুম থেকে জেগে বুকের উপর কিংবা মাথার দিকে দাঁড়ানো অশুভ কিছু অনুভব করে থাকেন। কেন হয় এমন?
্বিজ্ঞান ভুত Biggan Bhoot
মূলত, আমরা যখন জেগে থাকি, তখন আমাদের শরীরে ‘এডেনোসিন’ (Adenosine) নামক হরমোন জমা হতে থাকে এবং জানান দেয় যে, ঘুমানোর প্রয়োজন হয়েছে। যখন আমরা ঘুমাতে যাই, তখন তন্দ্রাভাব আনার জন্য শরীর নিজে থেকেই ‘মেলাটোনিন’র (Melatonin) মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, একইসাথে আমাদের স্বার্থে আমাদের শরীরকেও প্যারালাইজড করে দেয়। ঘুমের প্রয়োজন যখন ফুরিয়ে যায়, তখন মস্তিষ্ক আর শরীরকে চাঙ্গা করতে ভিড় জমাতে থাকে ‘কোর্টিসল’ (Cortisol)
্বিজ্ঞান ভুত Biggan Bhoot
ঘুমের মধ্যে আমাদের মস্তিষ্ক পাঁচটি ধাপ অতিক্রম করে। প্রথম ধাপে চোখে তন্দ্রা লাগে এবং দ্বিতীয়, তৃতীয় ধাপ শেষে চতুর্থ ধাপে সবচেয়ে গাঢ় ঘুমের ভিতরে থাকে মানুষ। গাঢ় ধাপের পরেই আসে র‍্যাপিড আই মুভমেন্টের ধাপ, যে ধাপে মানুষ স্বপ্ন দেখে। গভীর ঘুমে থাকা শরীরের আগেই যখন মস্তিষ্ক জেগে ওঠে তখনই ঠিক স্লিপ প্যারালাইসিসটা ঘটে। ঘুমে থাকা শরীর নড়াচড়া করতে না পারার দরুণ তৎক্ষণাৎ আতঙ্কিত মন বুকের উপর চেপে বসে থাকা ভূতের দৃশ্য মাথায় নিয়ে আসে, চোখের সামনেও তুলে ধরে। শরীর ঘুম থেকে জেগে ওঠার সাথে সাথে ভূতও উধাও হয়ে যায়।
স্লিপ প্যারালাইসিসের ঠিক উল্টাটাই ‘হিপনিক মায়োক্লোনিয়া’ (Hypnic Myoclonia)। মস্তিষ্কের আগেই জেগে ওঠে শরীর। এই ব্যাপারটা সাধারণত ঘটে ঘুমের প্রথম পর্যায়ে। ব্যাপারটা অনেকটা  তিন কিংবা চার গিয়ারে মোটরসাইকেল স্টার্ট করার মতো। ঘুমের মধ্যেই মনে হয় হাত বা পা ধরে হ্যাঁচকা টান দিচ্ছে কেউ, টেনে ফেলে দিচ্ছে বিছানা থেকে। ঘুমের মধ্যে ধড়মড় করে জেগে ওঠার সবচেয়ে পরিচিত যেকারণ সেটা হচ্ছে, মনে হয় হঠাৎ কে যেন ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল নিচে। এই স্বপ্নটা কিন্ত আমরা ঘুমানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি সাধারণত, যখন মস্তিক বিশ্রামে গেলেও চালু থেকে যায় শরীর।
কত রসিয়ে-কষিয়ে, মনের মাধুরী মিশিয়ে এতদিন বলা হয়েছে “নিজের চোখে দেখা” ভূতপেত্নির গল্পগুলো। বিজ্ঞানের রসকষবিহীন কিছু তথ্য পুরো ব্যাপারটাই পানসে করে দিল, না? এখন ভূতপেত্নি সামনে এসে হাজির হলেও গল্প বানানোর আগে চিন্তা করে নিতে হবে।
আজ এ পর্যন্তই, পরবর্তীতে আরো কিছু ভূতকে উধাও করতে হাজির হবো আরো কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখা নিয়ে। আর তার আগে যদি আপনার সামনে কোন ভূতপ্রেত এসে হাজিরও হয়, উল্টো ঘুরে দৌড় দেওয়ার আগে মাথাটা একটু খাটিয়ে দেখবেন। মনে রাখবেন, আপনি সেটাই দেখবেন, যেটা আপনি বিশ্বাস করতে চান। যুক্তি আর তথ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করলেই ভাঙবে সেই ভ্রান্ত বিশ্বাস।
Source - Neonaloy
Previous
Next Post »